সর্বশেষ:

ছায়া ভূত-মোঃ শামীম মিয়া।

ছায়া ভূত-মোঃ শামীম মিয়া।

ছায়া ভূত

                                         মোঃ শামীম মিয়া।

আমদির পাড়া গ্রামে এক অতিদরিদ্র ঘরে জন্ম আমার । আমার পিতার নাম মোঃ সৈয়দজ্জামান। আমাদের পরিবারটা বেশ বড়ই। আমরা চার ভাই বোন । দুই ভাই আর দুই বোন। আমরা দুই ভাই বোন দুটির ছোট । আমি সবার ছোট্ট। বাবা-মা অভাবের কারণে বড় বোন ভাইকে পড়াতে পারেন নী। তবে বাবা মার অভাবী মনে ছিলো আমাকে নিয়ে অনেক আশা । চোখ ভরা ছিলো স্বপ্ন। আমাকে তারা পড়াশুনা করাবেন। আমি ছাত্র বেশ ভালোই ছিলাম। এক বা দুই রোল ছিলোই। স্কুলের সব ম্যাডাম স্যার আমাকে বেশ ভালোবাসতেন। আমি যখন তৃতীয় শ্রেনীতে পড়ি। তখন আমার বড় বোন দুইটির বিয়ে হয়ে যায়। আমাদের সংসারে যেন আরো অভাব আসে।

বাবা একা একা আমাদের এতো বড় সংসারটা চালান। বাবার মুখের দিকে তাকানো যেতো না। বাবা মার চোখে আমি দেখেছি আমাকে, নিয়ে তাদের কতো স্বপ্ন। আমার স্কুলের খাতা কলম লাগবে আমি বাবা মার মুখের দিকে তাকালে আর বলতে পারিনা। আমি তো জানতাম বাবা মার কাছে টাকা নেই। অনেক সময় চেয়ে পেতাম আবার পেতাম না।

আমারও মনে অনেক আশা চোখে স্বপ্ন আমি একদিন অনেক বড় হবো। সেদিন ইনশাআল্লাহ্ আমাদের অভাব থাকবে না। আল্লাহকে প্রায় বলিতাম নামাজে আল্লাহ্ তুমি আমাকে তাড়াতাড়ি বড় করে দাও, আমাদের অভাব থেকে মুক্তি দাও। আল্লাহ্ তায়ালা যা করেন তাই ভালো, প্রায় মা বলতেন।
এক সময় আমাদের পরিবারে আরো অভাব নেমে এলো। এক বেলা খেলে দু বেলা খেতে পারতাম না। সে সময় বাবা-মা খাতা কলম কিনার টাকা দিতেই পারতেন না। আমি খাতা কলম কিনার টাকার জন্য স্কুল ফাঁকি দিয়ে অন্যের জমিতে কাজ করতাম।

যা আমার বাবা-মা জানতেন না। তারা জানলে হয়তো কষ্ট পেতেন। বাবার সাথে আমি সব কিছু শিয়ার করতে পারতামনা। তবে বাবা আমাকে আমাদেরকে খুব ভালোবাসেন। মা আমার খুব সহস সরল। এমন মার গর্ভে জন্ম নিয়ে আমি সত্যি র্গব বোধ করি। আমার আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন মা-বাবা আজও করছেন। আমি মহান আল্লাহ্ তায়ালার দরবারে দোয়া করি আল্লাহ্ তাদের অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখুন। কষ্ট পর কষ্ট সহয্য করে পড়া শুনা চালিয়ে যাই।
বেশ কয়েক মাস পর আমি চাকুরী পাই জুমারবাড়ী আলম ডেকোরেটরে । তার সঙ্গে আমার আরেকটি কাজ ছিলো তা হলো জুমারবাড়ী বাজারে কারেন্ট চলে গেলে জেনারেটর চালানো। আমি তখন এতো ছোট্ট ছিলাম যে জুমারবাড়ী বাজার থেকে আমাদের বাড়ী, বা আমদির পাড়া গ্রাম মাত্র এককিলো দুরে,একা যেতে পারতাম না। আমি জুমারবাড়ী আলম ডেকোরেটরে কাজ করে যা পেতাম তা দিয়ে আমার পড়াশুনা বেশ ভালো চলছিলো।

আমি পড়াশুনা করি, এজন্য আমার মহাজন মোঃ শাহ্-আলম (চাচা) এবং ওস্তাদ শফি (চাচা) আমাকে অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। তাই আমার পড়াশুনার কোন অসুবিধা হচ্ছিলো না।
যাই হক,
আমি আমার ওস্তাদ শফি চাচা এক সাথে ডেকোরেটরের কাজ করতে বিভিন্ন গ্রামে যাই। বেশ ভালোই লাগে কাজ করতে। অনেক মজা করতাম আমরা, ওস্তাদ আর আমি। অন্য অন্য গ্রামের মত আমরা আজ কাজ করছি, জুমারবাড়ী ডাঃ আব্দুর রাজ্জাক শিশু নিকেতন {কেজি স্কুলে}। আগামীকাল সকাল থেকে শুরু,থেকে সেখানে প্রতি বছরের মত এবারো বর্ষপুতি অনুষ্ঠান তিন দিন ব্যাপি। এই স্কুল গাইবান্ধা জেলার মধ্যে শিক্ষার মানে যেমন উজ্জল, বর্ষপূতি অনুষ্ঠানো তেমনী উজ্জল হয়।

আমাদের অনেক কাজ করতে হলো সেখানে। কাজ করতেই বেজে গেলো রাত বারটা। আমাকে বাড়ী যেতেই হবে। কারণ, আগামীকাল আমার পরিক্ষা আছে স্কুলে। দিনে একা যেতে পারিনা। রাতে কিভাবে একা বাড়ি যাবো আমার ওস্তাদকে বললাম। ওস্তাদ আমাকে বললো, আমি তোকে এগিয়ে দিয়ে আসবো। তবে রাস্তায় যদি তোদের বাড়ির কাউকে দেখা পাই তার সাথেই বাড়ি যাবি। আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম ঠিক আছে ওস্তাদ।
হাতমুখ ধুয়ে আমি আর ওস্তাদ চললাম আমাদের বাড়ির দিকে। এমন সময় দেখা হয় আমাদের গ্রামের এক লোকের সাথে। তাকে আমি চাচা বলেই ডাকি। আমি নিজেই ওস্তাদকে বললাম, চাচা আপনী বাড়ি যান। আমি এই চাচার সাথে যাই। ওস্তাদ আর আমার সাথে গেলেন না তিনি তার বাড়ী গেলেন। আমি আর এই চাচা চললাম বাড়ির দিকে, এমন সময় চাচাটার মোবাইল বেজে উঠে। ফোনটা এসেছে জুমাবাড়ী বাজার থেকে। এক দোকানদার ফোন দিয়েছেন।

তার মূল্যবান কোন কিছু রেখে এসেছেন বাজারে। চাচা আমাকে বললো, আমি একা বাড়ি যেতে পারবো কী না। আমি সাহস করেই বললাম, হ্যাঁ যেতে পারবো। চাচা বাজারে আবার চলে গেলেন। আমি কিছুদুর যেতেই, আমার মনে হলো আমি একা বাড়ি যাচ্ছি। পথে যদি ভূত ধরে। অমনী আমার শরীর একটা ঝাকুনী দেয়। জোসনার রাত ছিলো আমি মাটির দিকে লক্ষ করে চলছি সামানের দিকে। হঠাৎ রাস্তার পাশে কাঁঠাল গাছের উপড় ধাপাস করে কি যেন পড়লো। আমার শরীরের অবস্থা এমন হলো শব্দ শোনার পর মনে হলো শরীরে এক ফোটা রক্ত নেই। মনে পরে গেলো কয়দিন আগে মারা যাওয়া আমার চাচাতো বোনের কথা।

যেদিন আমার চাচাতো বোনটা মারা গেলো সেদিন বিভিন্ন কবিরাজ বলে ছিলো তাকে শরন নামে এক গায়েবী তুলে নিয়ে গেছে। কবিরাজরা তাকে অনেক অনুরোধ করেছিলো, ফিরে দেওয়ার জন্য। আমরা গ্রামের ছেলে, মেয়ে ময়মুরুব্বিরা সারা রাত আমার বোনটা কে খুজেছি। কিন্তু কোথাও পায়নী । আমার চাচাতো বোনটার বয়স ছিলো মাত্র চার থেকে পাঁচ বছর। তাকে আমরা ফোজরের আযানের বেশ কয় মিনিট আগে চাচাদের বাড়ির সামনে একটা জমির মধ্যে পাই। আসলে সেই জমিতে আমরা অনেকবার খুজেছিলাম। সকাল হতেই একজনার চোখে পরে চাচাতো বোনের মরা দেহ। কবিরাজরা ছিলোই তারা বললেন, গায়েবী আযানের একটু আগেই ফেলে দিয়ে যায়। সেদিন আমাদের গ্রামের সবার চোখে পানি ছিলো সবার মুখে একটাই প্রশ্ন ছিলো কি অপরাধ করেছিলো এই দুধের শিশুটি ? আজ আমি মাঝ রাতে সেখানেই, কখন যেন আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।

হাটছি না দাড়িয়ে আছি কিছু বুঝচ্ছি না। হঠাৎ আমার কানে ভেসে আসে শিশু কান্নার শব্দ। চিৎকার দিবো দিবো বলে ভাব, এমন সময় লক্ষ করে দেখি। আমার আগে আগে ইহা বড় একটা ছায়া হাটছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না। আমি আর চিৎকার দিতে পারলাম না। মন্টাকে কঠিন করে মনে মনে বললাম, এখন যদি চিৎকার দেই। ছায়া ভূতটি আমাকে ধরবে। তার চেয়ে একটু গতি বাড়িয়ে হাটি। কখনো চোখ বন্ধ করে হাটি কখনো অন্য দিকে মুখ ঘুড়িয়ে হাটি। আমার শরীরে একটুও যেন শক্তি নেই, শুধু হাপাচ্ছি, গা দিয়ে বৃষ্টির মত ঘাম ঝড়ছে। মনে মনে বলছি আজ বুঝি আমি শেষ, আমার জীবনটা বুঝি চলে যায়। হঠাৎ আমার মা জননীর কথা আমার মনে পরে। মা জননী প্রায়ই বলতেন, বাবা যদি কখনো বিপদে পড়িস, তাহলে দোয়া বলবি। দেখবী সব বিপদ দুর হয়ে যাবে। দেরি না করে আমি দোয়া পড়তে শুরু করলাম, রাস্তার মাঝে দাড়িয়ে তবে চোখ বন্ধ করে।

দশ থেকে বারো মিনিট পর নিজেকে যেন হালকা, হালকা, লাগতে শুরু করলো। চোখ খুলে দেখি সেই ছায়া ভূটি আর নেই। দুরে একটা আলো দেখা যাচ্ছে। মনে হয় আমার দিকেই আসচ্ছে। মনে তখন একটা সাহস এলো। আমি গুটি গুটি পায়ে এগতে থাকলাম আলোটির দিকে। সামনে এসে আলো টি থামলো। আলোটি ভ্যান গাড়ির, আমাদের বাড়ির পেছনে বাড়িতে ভ্যান চালক চাচাটার বাড়ি। তিনি আমাকে ভ্যানে করে বাড়িতে পৌছে দিলেন। আমি তাকে এসবের কিছু বললাম না। মাকে সব খুলে বললাম।

মা আমার, দোয়া বলে আমার গায়ে তিন বার ফু দিলেন। আর একটা লৌহা গরম করে আমাকে তার পানি খাওয়ালেন। মাকে আমি প্রশ্ন করলাম, মা তুমি লৌহা গরম করা পানি আমাকে খাওয়ালে কেন? মা বললো, কেউ ভয় পেলে তাকে লৌহা গরম করা পানি খাওয়ালে ভয় কেটে যায়। আমি ভাত খেয়ে কিছুক্ষন পড়লাম তারপর ঘুমালাম ফোজরের নামাজ পড়েই।

সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিক্ষা দিতে গেলাম। পরিক্ষা ভালোই দিলাম। তবে সে থেকে আমি আর বাড়ি যাইনা রাতে, জুমারবাড়ী আলম ডেকোরেটরে থাকি। সকালে বাড়িতে আসি তারপর স্কুলে যাই রোজ। এখনো আমি জুমারবাড়ী আলম ডেকোরেটরে কাজ করি, করছি।

আরো খবর: