গল্প-অসহায় পাখি

গল্প-অসহায় পাখি

মোঃ শামীম মিয়া।

অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে ছিলো এক রাজা। তার ছিলো একটি পোষা বুলবুলি পাখি। বুলবুলি দেখতে যেমন সুন্দর তেমনী তার মিষ্টি সুর। মুধুর সুরে গান গেয়ে ঘুম ভাঙ্গাতো রাজার। রাজা মুগ্ধ বুলবুলির গানে। রাজার রানী ছিলো দুটি। তবে রাজ্যের রানীদের গানে কাজে মুগ্ধ করতে পারিনী বুলবুলি। বুলবুলি কে রাণীরা ভালো তো বাসেই না। বুলবুলি যেন তাদের দু-চোখে বিষ। তাই বুলবুলিকে নিয়ে নানান ধরনের কথা রাজাকে বলে রানী। রানীরা কি কি করবে সারাদিন বুলবুলি তা রাজাকে আগেই বলতো। শুধু রানীদের কথা নয় বলতো পুরো রাজ্যের কথা। এমনকী রাজা কখন কোন দেশে বা কোথায় যাবে তাও বলে দিতো বুলবুলি। তাই  রাজার প্রিয় ছিলো বুলবুলি পাখিই।

হঠাৎ সেদিন বুলবুলি অসুস্থ হয়ে যায়। মুখে কথা বলতে পারেনা বুলবুলি। সেদিন রাজা অসুস্থ পাখির পাশে বসে বললো, বুলবুলি আমি আমদির পাড়া নামে এক রাজ্যে যাবো সেখান থেকে এসে তোমার সাথে দেখা হবে। তুমি কোন চিন্তা করো না তোমার চিকিৎসা নিয়ে । তুমি তো জানো তোমার চিকিৎসা নিতে এদিকে দশজন ডাক্তার আছে। আরো যদি ডাক্তার লাগে মন্ত্রিরা আনবে। বুলবুলি রাজার দিকে তাকিয়ে আছে কী যেন বলবে কিন্তু বলতে পারলো না। শুধু চোখের পানি বইছে বুলবুলির চোখ দিয়ে। রাজা ভাবলো বুলবুলিকে রেখে যাচ্ছি তাই হয় তো কাঁদচ্ছে। রাজা বুলবুলির সাথে কথা বলতেই দুই রাণী রাজার দুই পাশে দ্বারায়। এবং বুলবুলির দিকে হয়ে মুখ ভ্যাংছিয়ে ইশারায় বলে রাজাকে যেতে দে তারপর তোর খবর আছে। অবশেষে বুলবুলিরেকে রেখে রাজা চলে যায় আমদির পাড়া রাজ্যে।

দুই রাণী, ভাবছে বুলবুলিকে কী ভাবে তাড়ানো যায়। ছোট রাণী বড় রাণী কে বলে বুলবুলিকে বিষ খাওয়া মেরে ফেলবে। আবার বড় রানী বলে তা হবে না। ওকে আমরা অসুস্থ অবস্থায় বনের কোনো জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসি। ওখানে সে ধিরে ধিরে মারা যাবে। তবে রাজা জানবে রাজার খোঁজে বুলবুলি বেড়িয়েছে আর ফিরে আসেনী। বুলবুলি আগম জানে তাই কাঁদছে মুখে কথা বলতে পারছে না। সে জানে আজ রাতে কী হতে যাচ্ছে। ডাক্তারা মনে করলো রাজার জন্যই বুলবুলি কাঁদছে। গভির রাতে দুই রাণী পাহারাদার,ডাক্তারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গহিন জঙ্গলে রেখে আসলো বুলবুলিকে।

রাণীরা খুশি হলো আনন্দে নাচতে লাগলো। এদিকে বুলবুলি পাখি কাঁদছে, তার কান্না শুনে ছুটে এলো বানর, বানরকে দেখে বুলবুলি লুকিয়ে যাবে এমন ভাব তার মনে। বানর বললো, বন্ধু তুমি ভয় পেওনা। তবে তুমি কাঁদছো কেন, বুলবুলি পাখিদের ইশারাই বললো, আমি এই বনে নতুন এসেছি। আমি খুব অসুস্থ তবে আমি এতো দিন রাজার রাজ্যে ছিলাম। তাই বনের কোন কিছু চিনিনা। বানর বললো, বন্ধু তোমার কোন ভয় নেই। আমি আমার অন্য বন্ধুদের ডাক দিচ্ছি সবাই আসলে একটা ব্যবস্থা হবে। বানর বানরের ইশারাই তার অন্য বন্ধুদের ডাকলো। সবাই চলে এলো , তবে একটু আসতে দেরি করলো হাজারো জোনাকী পোকা। তারাও এলো তখন যেন আলোই আলোকিত হলো গহিন জঙ্গল অবাক হয়ে গেলো বুলবুলি ভয়ও করছে। সবাইকে বুলবুলির ইশারায় তার এখানে আশার গল্প বললো। সবাই বললো, বুলবুলি তো শুধু রাজার নয় পুরো রাজ্যের উপকার করতো। আজ সেই বুলবুলির এমন অবস্থা করে ছাড়লো রাণীরা। বুলবুলি তো অসহায় একটি পাখি। অন্য এক বুলবুলি আরেক বুলবুলিকে বললো যাও আমাদের ডাক্তারকে ডাকো ? সে বুলবুলিটা গেলো ডাক্তার আনতে । এলো বুলবুলিদের ডাক্তার এক বুলবুলি পাখি। এসেই ডাঃ বুলবুলি  বললো, পানি লাগবে ? পাখি গুলো  একে অপরের দিকে দেখছে। একেক জন আরেক জনকে বলছে এই রাতের আধারে কেমন করে যাবো নদীর ওপারে। হঠাৎ জোনাকী পোকা বললো, আমরা থাকতে কেন চিন্তা করছো তোমরা? তোমরা আমাদের কে তোমাদের মুখে নাও আমরা আলো দিবো তোমরা সেই আলোতেই যাবে। বুলবুলিরা খুশি হয়ে জোনাকীর কথা মত চললো নদীর দিকে পানিও আনলো। অন্য অন্য জীবজন্তু যে যা ভাবে পাচ্ছে সেই ভাবে সাহায্য করছে ডাক্তারের কাজে।

প্রায় দুই ঘন্টা পর সুস্থ হয় বুলবুলি, কথা বলতে পারে। বুলবুলির মুখে মানুষের মতো কথা শুনে ভয় পেয়ে যায় অন্যরা। বুলবুলি বললো, ভয় পেয়ো না। আমি সেই ছোট্ট বেলা থেকে রাজ্যে বড় হয়েছি। কোনদিন তোমাদের মতো এতো সুন্দর বন্ধুদের দেখা পাইনী। আজ বুঝেছি যার মর্ম তাই বুঝে। সুখ ওই রাজ্যে নাই যে সুখ আছে এই জঙ্গলে । তোমরা সামান্য পানির জন্য কতোই না কষ্ট করো। ক্ষুধার সাথে করো যুদ্ধ। তবুও তোমরা আমার চাইতে অনেক সুখি, অনেক শক্তি তোমাদের বাহুতে। আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে চাই। রাজাকে বলে এই গহিন জঙ্গলে একটা পুকুর খুড়ে নিবো যাতে তোমাদের পানির কোনো অভাব থাকে না। অনেক অনেক খাদ্যের ব্যবস্থা করে নিবো। এক কোকিল পাখি বললো, বন্ধু যে রাজ্যে থেকে তোমাকে বেড় করে দিলো সেই রাজ্যে আবার ফিরে যাবে ? বুলবুলি পাখি বললো, আমি এক অসহায় পাখি, আমার বাবা মা কে আমি কোন দিন দেখিনী বুঝেছি এই রাজ্যেই আমার জন্ম । আমার যখন কেউ ছিলো না তখন রাজাই আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলো তাছাড়া রাজা তো আমাকে বেড় করে দেইনী। এক দোয়েল পাখি বললো, সত্যি বন্ধু তুমি খুব ভালো তবে রাণীরা যে তোমাকে রাজ্য থেকে বেড় করে দিলো তুমি রাজাকে গিয়ে কী বলবে ? বুলবুলি বললো, রাজা আসবে আগামীকাল তোমাদের সবাইকে সেখানে নিয়ে যাবো তারপরই বুঝতে পারবে। হঠাৎ শিকারীদের গন্ধ পেয়ে যায় সবাই। বুলবুলিকে সবাই বললো, চলো বন্ধু আমরা এখান থেকে পালাই মানুষ নামে কিছু পাশান  শিকারীর দল এসেছে। বুলবুলি বললো, আমি বুঝলাম না, মানুষরাও তোমাদের ক্ষতি করে। এক বক খক খক করে হেসে বলে বন্ধু মানুষের মাঝে থাকো মানুষকে চিনলে না। বুলবুলি বললো, বন্ধুরা বিশ্বাস করো আমি এসব কিছু জানিনা। সবাই বললো, এখন এখান থেকে পালাই। যেতে যেতে তোমাকে সব বলি। তারা উড়াল দিলো অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য। পথেই বুলবুলিকে এক বক বললো, বন্ধু শিকারীদের জন্য আমরা ঠিক মত খাদ্য সংগ্রহ করতে পারিনা। কখনো গুলি, ফাঁদ,জাল, বিষ,ইত্যাদি আধুনিক যন্ত্র দিয়ে আমাদের শিকার করে। এই শিকারীদের জন্য কতো পাখির ছানা যে ইতিম হয়েছে তা বলা বাহুল্য। বুলবুলি বললো, বন্ধুরা তোমরা কোন চিন্তা করো না আমি এর সব ব্যবস্থা করছি।

এই গল্প ঐগল্প করতেই সকাল হয়ে যায়। বিকালের দিকে আসে রাজ্যে রাজা।  এসেই বুলবুলিকে ডাকচ্ছে। দুই রাণী চিন্তায় পরে য্য়া এখন রাজাকে কি বলবে তারা।  রাজা রাণীদের বলে বুলবুলি কোথায় ? রানীরা বলে বেইমান পাখি আমাদের কোন কিছু না বলে চলে গেছে কোন জায়গায়। রাজা জানে রাণীদের সমন্ধে। তবুও রাগ করলো না রাজা ভাবছে কী করবে। এর মধ্যে হাজির হয় রাজ্যে বুলবুলি সহ হাজারো পাখি। অবাক হয় রাজাসহ রানীরা। বুলবুলি এসেই রাজাকে সালাম জানায় রাজাকে। রাজা উত্তর দিয়ে বলে বুলবুলি তুমি কোথায় গিয়েছিলে ? বুলবুলি বললো , হুজুর আমি আমাদের বুলবুলি পাখি ডাক্তারের কাছে গিয়ে ছিলাম। হুজুর আমি ভালো হয়েছি তবে আজ আমি আপনার কাছ থেকে কিছু চাইবো আমাকে দিবেন ? রাজা বললো, হ্যাঁ দিবো। এদিকে রাণীরা মনে মনে বলে পাখি বাঁচলো কী করে, তাছাড়া পাখি আমাদের ভালো বাসেই বলে আমাদের দোষের কথা রাজাকে বললো না। রাণীরা সত্যি তাদের ভুল বুঝতে পারলো। বুলবুলি রাজাকে বনের শিকারী বন্ধ থেকে পানীর সমস্যার কথা বললো। রাজা তাদের কথা দিলো তাদের সমস্যার সমাধান কিছু দিনের মধ্যেই করবে। বনের সব পশু-পাখিরা খুশি হলো।

এদিকে বুলবুলি কখনো রাজ্যে কখনো বনে থাকে। রাণীরাও বুলবুলিকে ভালোবাসে। সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো বনের পাখিরা আর তাদের কোন ভয় নেই। আর বুলবুলির আগম কথাতেই রাজ্য অনেক ক্ষতির হাত থেকে বাঁচে আলোকিত হতে থাকে রাজ্য। বুলবুলির গানে রোজ রাজার ঘুম ভাঙ্গে।

সমাপ্ত

আরো খবর: