নতুন মা এমন কেন মা ?

নতুন মা এমন কেন মা ?

মো: দিপু সরকার: মা তুমি কোথায়? মা তুমি কত দূরে ? কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে ? আমার কথা কি তোমার একটুও মনে পরে না। জানো মা তুমি আকাশের তারা হয়ে গেলে, তার পর বাবা আমার জন্যে বাজার থেকে একটা ভাল মা নিয়ে এসেছে। ভাল মা কি যে ভাল! তোমার সাথে রাত ভর কথা বলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে গরম লোহার স্যাকা দেয় ! আর স্যাকা দেওয়ার সময় মুখের মধ্যে গামছা পুরে দেয়, যাতে কেউ আমার চিৎকার শুনতে না পারে। আমার হাতে পায়ের ক্ষত যদি তুমি দেখতে মা, তবে ওখানে বসে থাকতে পারতে না। সারা দিন ছোট বোনটাকে রাখতে হয়, ও যদি মশার কাঁমড়েও কেঁদে উঠে সেদিন কনকনে শীতে আমার জন্যে সারা রাত ঘরের দরজা বন্ধ।
আমার বয়সী সবাই কত হেসে খেলে স্কুলে যায়, আমি নাকি পোড়া কপাল নিয়ে জন্মেছি, আমি নাকি রাক্ষস, জন্মেই তোমাকে খেয়েছি, আমার পেট কি এত বড় মা! দুটো কিল-চর খেয়েই পেট ভরে যায়, তোমাকে কি করে খেলাম! আমার কপাল কেন অন্য আর দশ জনার মত নয় কেন মা? আমার ঘরের এক পাশে ছাগল থাকে, ছাগলের চানার কি যে গন্ধ মা, ঘুম আসে না। জানো মা, ফকির কে ভাল ভাত খেতে দেয়, আর আমাকে দেয় পোঁড়া ভাত। বাজার থেকে যদি কিছু কিনে আনতে দেয়, নিয়ে এলে আবার মেপে দেখে, জিনিস কমএনে আমি টাকা চুরি করেছি কি না। বলো মা আমি কি চোর আর আমি টাকা চুরি করে কি করব! জানো মা, ছোট বোনটা কত সুন্দর আপেল, কমলা, আঙ্গুর খেতে শিখেছে। ওর খাওয়া দেখলে আমারও না জিভে জল আসে!

লুকিয়ে একটি খেলে, ও গিয়ে মায়ের কাছে বিচার দেয়। সেদিন ভাল মা আমার জিভে আগুনের মত লাল লোহা দিয়ে স্যাকা দেয়। ছোট বোনটির জ্বর হলে ভাল মা রাত জেগে মাথায় জল পট্টি দেয়, মাথায় পানি দেয়, ডাক্তার নিয়ে আসে। আমার জ্বর হলে চেয়েও দেখেনা বরং বলে কাজ ফাঁকি দেবার জন্যে নাকি জ্বর বাঁধিয়েছি। বাবা বাজার থেকে খাবার কিছু নিয়ে এলে বয়োমে তুলে রাখে আমাকে দেয় না। যে দিন ভাল খাবার রান্না হয় সেদিন কি যে সুন্দর ঘ্রাণ বের হয়! মনটা ভরে যায়। গন্ধে পেটের ক্ষুধার জ্বালাটা বড্ড বেশি বাড়ে মা, কিন্তু ওদের আগে তো খাওয়া বারণ, তাই জিভ দিয়ে কফোঁটা জল নিজের অজান্তেই বের হয়। সবাই খায়, আমি চেয়ে থাকি, সবার খাওয়া শেষে খেতে বসি, কখনও দু একটা হাড় হড্ডি ভাগে পরে কখনও তাও পরেনা। জানো কত দিন দুধ মাখা ভাত খাইনি!

আদর করে কেউ কাছে ডাকেনি! প্রতি ঈদে সবাই কত সুন্দর নতুন জামা কাপড় পরে, আমার এ ছেড়া জামা ছেড়াই থেকে যায়। আমাকে দেখলেই কেন জানি ভাল মার হাসি মুখটা কালো হয়ে যায়, আর রাগে আমাদের কালো বিড়ালটার মত ফুলে উঠে, বলতো মা, ভাল মা এমন কেন? বাবাও আগের মত নেই, সূর্য ওঠার আগে বেড় হয়ে যায়, আসে অনেক রাতে। বাবা এলে শুয়ে শুয়ে ভাবি বোধ হয় আমাকে ডাক দিবে, খেয়েছি কিনা জিজ্ঞেস করবে কিন্তু আমার আশা, আশাই থেকে যায়। আগে মাঝে মাঝে খোঁজ নিত, এখন ছয় মাসে একবার নেয় না। আমার মনে হয় বাবা ভুলেই গেছে আমিও তার একটা সন্তান। বিধাতার উপরে মাঝে মাঝে রাগ হয়, সবারি তো মা আছে আমার কেন নেই। আমার এভাবে আর ভাল লাগে না মা। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে চল। আমি তোমার কো্লে বসে গান শুনব, দুষ্টুমি করলে কান মলে দিবে আবার বুকে জড়িয়ে আদর করবে। বলনা মা তুমি কবে আসবে কাউছার বয়স যখন দেড় বছর, তখন ওর মা মারা যায়।

আমাদের এদিকে নিয়ম হল রাতে বিয়ে না হলে বিয়ে জমেনা। রাতে যখন এই মহিলা বাসর ঘরে ঢুকল, ঢুকেই দেখল এই ছেলেটা ঘুমিয়ে আছে। মহিলা দেখেতো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। রাগে যেন মহিলার চোখ মুখ দিয়ে আগুন বের হচ্ছিল। মহিলার মুখে একটাই কথা, “এই ছেলে এই ঘরে থাকলে আমি থাকবো না। হয় আমি থাকব, না হয় এই ছেলে থাকবে”।বাধ্য হয়ে পাশের ছাগল রাখার ঘরেই রাখতে হয় ওকে। পরে ওর কান্না শুনে প্রতিবেশীরা ওকে নিয়ে যায়। তিন বছর বয়স পর্যন্ত ও প্রতিবেশীদের বাসাতেই থাকতো। কত দিন শুনেছি আমার আম্মুকে এসে বলেছে “আমি সারা দিন কিছু খাইনি, কিছু খেতে দিবেন” ওর কথা শুনে আমার চোখে জল এসে গেছে। আজ ওর বয়স ষোল। আজো ও স্বাধীন হতে পারেনি। আজ সবার বিবেকের কাছে আমার প্রশ্ন এই মা হারা শিশু গুলো আর কত দিন এভাকে অমানুশিক নিযাতনের স্বীকার হবে। এদের জন্যে কি আমাদে কিছুই করার নেই? “এই পৃথিবীর অপবিত্র পরিবেশটাকে বাস যোগ্য করে যেতে চাই”।

আরো খবর: